25/08/2026
"আজ ২৬শে আগস্ট, এই দিনেই ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ পুলিশ দলকে পর্যুদস্ত করে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সেই ঐতিহাসিক প্রথম শিল্ড জয়"
২৬ শে আগস্ট ১৯৪৩, শিল্ড ফাইনালে ব্রিটিশ পুলিশদের পর্যুস্ত করে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব I সেদিনই প্রথমবার ময়দান থেকে বলা শুরু হয়েছিল "ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো" I ফিরে দেখা যাক ঠিক এক বছর আগের প্রেক্ষাপট I '৪২ এ দেশ জুড়ে শুরু হয়ে গেলো মহাত্মা গান্ধীর ডাকে 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন' কলকাতার রাস্তাঘাটে আন্দোলনকারী হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষদের উপর শুরু হলো ব্রিটিশ পুলিশের অবর্ণনীয় অত্যাচার I এরপর ১৯৪৩, চারিদিকে দুর্ভিক্ষ। এক মুঠো অন্নের জন্য হাহাকার। এর মধ্যেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথমবারের জন্য শিল্ড জয়। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা আই.এফ.এ. শিল্ডের ফাইনালে ব্রিটিশ পুলিশদের ৩-০ গোলে চূড়ান্ত ভাবে পর্যুদস্ত করে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব বদলা নিয়েছিল সাধারণ মানুষের উপর ব্রিটিশ পুলিশদের নির্মম অত্যাচারের I ময়দানের সবুজ মাঠে প্রথমবারের জন্য শোনা গেলো "ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো I" ক্লাব সভাপতি নলিনী রঞ্জন সরকার এতদিন যে লড়াইটা লড়ছিলেন গান্ধীজির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে, সেই লড়াইটাই ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র ক্রীড়াক্ষেত্র জুড়ে, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হাত ধরে I এর আগেও ভারতীয় ক্লাব শিল্ড জয় করলেও ক্রীড়াক্ষেত্র জুড়ে মানুষদের মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার বা চেতনা বিকশিত করতে পারেনি, যেটা করে দেখিয়েছিলো ইস্টবেঙ্গল ক্লাব I ইস্টবেঙ্গলের এই জয়ে আন্দোলিত হয়েছিল সারা বাংলা I হ্যা, আমরাও পারি - ময়দানের সবুজ ঘাসে ইস্টবেঙ্গলের এই লড়াই সাহস জুগিয়েছিল সমগ্র বাংলার মানুষদের I সেই লড়াইয়ের জোয়ার বৃহদ থেকে বৃহত্তর হতে হতে মাত্র চার বছরের মধ্যেই ভারত থেকে ব্রিটিশ বিদায় আর ভারতের স্বাধীনতা I
'৪৩ এর সেই ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের প্রতিটি ধাপ এক এক করে তুলে ধরলাম I শিল্ডের দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা আর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম খেলা পড়লো কুষ্টিয়ার শিবকালী মেমোরিয়াল ক্লাবের সঙ্গে জুলাইয়ের ২২ তারিখ I খেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জয়ী হলো ৮-১ গোলে I ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোল করেন আপ্পারাও-৪, সোমানা-৩ ও সুনীল ঘোষ ১ টি I শিবকালী মেমোরিয়াল ক্লাবের একমাত্র গোলকারী জোয়ারদার I
শিল্ডের তৃতীয় রাউন্ডের খেলা আর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের দ্বিতীয় খেলা পড়লো বি. আই. ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে জুলাইয়ের ২৭ তারিখ I খেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জয়ী হলো ৩-০ গোলে I ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোল করেন সোমানা-২ ও আরোকিরাজ ১ টি I ইস্টবেঙ্গল ক্লাব উঠে গেলো কোয়ার্টারফাইনালে I
কোয়ার্টারফাইনাল খেলা পড়লো ভবানীপুরের সঙ্গে আগস্টের ৭ তারিখ I খেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জয়ী হলো ১-০ গোলে I ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোলটি করেন সোমানা I
সেমিফাইনাল খেলা পড়লো বি.এ. রেলওয়ের সঙ্গে আগস্টের ১৩ তারিখ I খেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব জয়ী হলো ৭-১ গোলে I ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোল করেন সোমানা-৪, এস. চ্যাটার্জি-২ ও আপ্পারাও ১ টি I বি.এ. রেলওয়েরর একমাত্র গোলদাতা বি.কর I
২৬ আগস্ট ক্যালকাটা গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত শিল্ডের ফাইনাল খেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ৩-০ গোলে পর্যুদস্ত করে ব্রিটিশ পুলিশ দলকে I ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে গোল করেন আপ্পারাও, এফ. সিংহ ও সোমানা I
১৯৪২ সালে শিল্ড ফাইনালে দারুন খেলেও ইস্টবেঙ্গল ক্লাব রানার্স হয়, কিন্তু '৪৩ এ প্রতিটা ম্যাচে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলীর নিদর্শন রেখে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রথমবারের জন্য শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হয় I '৪৩ এর শিল্ডে ৫ টি ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব গোল করেছিল ২২ টি, গোল খেয়েছিলো মাত্র ২ টি, ক্লাবের হয়ে সর্বাধিক গোলকারী সোমানা - ১১ টি I
তবে শিল্ড চলাকালীন তৎকালীন বাংলার পরিস্থিতি অসম্ভব রকম খারাপ ছিল I চারিদিকে দুর্ভিক্ষ। এক মুঠো অন্নের জন্য হাহাকার। এর মধ্যেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রথমবারের জন্য শিল্ড জয় করলো। তবে অন্য ক্লাব গুলোর মতো প্রথম শিল্ড জয়ের আনন্দে উল্লাস না করে ঝাঁপিয়ে পড়লো দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের সেবায়। খোলা হলো লঙ্গরখানা। একটানা মাসাধিক কাল ধরে লক্ষ লক্ষ নিরন্ন মানুষদের মুখে অন্ন তুলে দিলো ইস্টবেঙ্গল ক্লাব।
তবে আই.এফ.এ.শিল্ডের ফাইনাল ম্যাচের জয়েই কিন্তু সব কিছু ক্ষান্ত হয় নি I এর সাথে আরো কিছু ঘটনার সাক্ষী থেকেছে ফুটবল মহল I ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সুরেশ চৌধুরীর স্বপ্ন ছিল মৃত্যুর আগে যেন তিনি দেখে যেতে পারেন তার হাতে তৈরী ক্লাব শিল্ড জয় করেছে I '৪৩ এ শিল্ড ফাইনালের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২৬ শে আগস্ট আপ্পারাও, এফ. সিংহ আর সোমানার গোলে ইস্টবেঙ্গল যখন ব্রিটিশ পুলিশকে পর্যুদস্ত করলো, তখন সুরেশ চৌধুরী বিছানায় শয্যাশায়ী, চলাফেরা আর কথা বলার শক্তিটুকু ও তার নেই I শিল্ড বিজয়ের পর সেই শিল্ড ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের খেলোয়াড়রা প্রথমেই নিয়ে আসেন জোড়াবাগানের সুরেশ চৌধুরীর বাড়ি। তিনি পরম মমতায় দীর্ঘক্ষণ শিল্ডের গায়ে হাত বোলাতে থাকেন। যেন পরম মাতৃস্নেহে মা কে আদর করছেন। কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেননা, শুধু দুই চোখ দিয়ে অবিরাম আনন্দশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেখানে উপস্থিত ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়াড় আর কর্তারাও কাঁদছেন। সে এক দুর্লভ ক্ষণ, এক স্মরণীয় মুহূর্ত। তার কিছুদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর সুরেশ চৌধুরী প্রয়াত হন I ২০ সেপ্টেম্বর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে সুরেশ চৌধুরীর স্মরণ সভার দিন ধার্য হয় I সেদিন আবার ক্লাব মাঠে কুচবিহার কাপের ফাইনাল খেলা ইস্টবেঙ্গলের সাথে রবার্ট হাডসন দলের বিরুদ্ধে I ক্লাবের প্রতিটি খেলোয়াড় শপথ নেন ব্রিটিশ দলকে আবারো পরাজিত করে তারা কুচবিহার ট্রফি জয় করবে ও সুরেশ চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদন করবে I সুনীল ঘোষ ও আরোকিরাজের গোলে ২-০ গোলে জয়লাভ করে ইস্টবেঙ্গল কুচবিহার কাপ জয় করে ও ক্লাব তাঁবুতে প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতিতে অর্পণ করে - এরকম উদাহরণ ময়দানে বিরল I
25/08/2026
25/08/2026
25/08/2026
25/08/2026
24/08/2026
24/08/2026